দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে তা ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই এখন খেলাপি। দেশের ইতিহাসে এত পরিমাণ খেলাপি ঋণ অতীতে কখনই দেখা যায়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
প্রতি তিন মাস পরপর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক তথা ৩০ সেপ্টেম্বরের খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়েছে গতকাল। এতে দেখা যায়, শুধু আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর—এ তিন মাসেই ব্যাংকগুলোয় ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। গত জুন শেষেও তা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও লুণ্ঠন হয়েছে। ঋণের নামে অনেক ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের অর্থ লুটেছেন চেয়ারম্যান-পরিচালকরা। সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ী তথা অলিগার্করাও ব্যাংক থেকে বাছবিচার ছাড়াই ঋণের নামে অর্থ হাতিয়েছেন। এক্ষেত্রে লুটেরাদের সহযোগীর ভূমিকায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যাংক খাত লুটের ক্ষতগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এ কারণেই খেলাপি ঋণ এতটা নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেকেছে। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাবে খেলাপি হয়েছেন কিছু ভালো গ্রাহকও।
অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ লাগামহীন গতিতে বাড়লেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সেটি ছিল অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এবারই প্রথম বেসরকারি ব্যাংকগুলোরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার অস্বাভাবিক বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত তিন মাসে কেবল বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। জুন শেষে এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৯২২ কোটি টাকা থাকলেও সেপ্টেম্বরে এসে তা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণও গত তিন মাসে বেড়েছে। জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এসে খেলাপি হওয়া এ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৬ হাজার ১১১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের বিতরণকৃত ঋণের ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশই এখন খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকার ঋণ, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলেও সরকারি বিশেষায়িত ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা কিছুটা সহনীয় অবস্থানে রয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। আর সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংক তথা বাংলাদেশ কৃষি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮১৪ কোটি টাকায়। এসব ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি।